সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা বাতিলের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের করা সুপারিশ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে পোশাক খাতের শীর্ষ দুটি সংগঠন। মূলত দেশের প্রধান রফতানিমুখী শিল্প পোশাক খাতকে উৎসাহিত করতেই বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) যৌথভাবে এ দাবি জানিয়েছে। সংগঠন দুটি বলছে, ভারত থেকে সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিল করা হলে পাটের মতো দ্বিতীয় শিল্প হিসেবে ধ্বংস হবে তৈরি পোশাক খাত।
রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা। তারা বলেন, দেশের প্রধান রফতানিমুখী শিল্প পোশাক খাত। এখান থেকে ৮২ শতাংশ আয় হয়। এর মধ্যে এককভাবে নিট পোশাক খাতের অবদান প্রায় ৫৫ শতাংশ বা প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, শিল্প প্রবৃদ্ধি ও লাখো মানুষের কর্মসংস্থান এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। এ প্রেক্ষাপটে স্পিনিং খাতকে বিশেষ সুবিধা দিতে বন্ড সুবিধা বাতিল করা হলে এ পোশাক শিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যাবে। যেকোনো পণ্য আমদানিতে শুল্ক আরোপ করতে হলে নীতিমালা মানতে হয়। আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুযায়ী, শুল্কারোপের আগে স্থানীয় শিল্পে ক্ষতির প্রমাণ দিতে হয়, যা এ ক্ষেত্রে মানা হয়নি এবং এটি সরাসরি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সেফগার্ড চুক্তির লঙ্ঘন। যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে ‘৩০ কার্ডেড’ এক কেজি সুতা ২ দশমিক ৫০ থেকে ২ দশমিক ৬০ ডলারে বিক্রি হয়, সেখানে বাংলাদেশে ৩ ডলারে সরবরাহ করতে চাচ্ছে। ফলে প্রতি কেজি সুতায় প্রায় ৪০ সেন্ট বা ৪৬ টাকা বেশি দাম হবে। ভারতীয় সুতা আমদানি বন্ধ হলে আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় দেশীয় স্পিনিং মিল একচেটিয়া বাজার করতে পারবে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য দেন বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববাজারের মন্দা ভাব, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটের মতো ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ যখন আমাদের শিল্পকে কোণঠাসা করছে, ঠিক তখনই সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের মতো এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আমরা পোশাক রফতানিকারকরাই বাংলাদেশের স্পিনিং মিলগুলোর উৎপাদিত সুতার একমাত্র ক্রেতা, তারপরও পোশাক শিল্পের স্বার্থকে উপেক্ষা করে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্যারিফ কমিশন। এটি শুধুই অনভিপ্রেতই নয়, বরং নীতিগতভাবেও চরম প্রশ্নবিদ্ধ।’
তিনি আরো বলেন, ‘একটি বিশেষ খাতের পদ্ধতিগত অদক্ষতাকে আড়াল করতে গিয়ে দেশের প্রধান রফতানি খাতকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোয় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার সুতা অবিক্রীত পড়ে থাকার যে খতিয়ান দেয়া হচ্ছে সেটি সত্য কিনা, তার উত্তরটা বাজার অর্থনীতির সাধারণ নিয়মেই নিহিত। এখন যদি আমদানিতে বন্ড সুবিধা বন্ধ হয়ে যায় তাহলে প্রতি কেজি সুতার দাম বাড়বে ৪০ সেন্ট বা ৪৬ টাকারও বেশি। তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে মাত্র এক বা আধা সেন্টের হেরফেরে অর্ডার হাতছাড়া করি, সেখানে কাঁচামালের পেছনে কেজিতে অতিরিক্ত ৪০ সেন্ট ব্যয় করা মোটেও বাস্তবসম্মত নয়। এককথায় জেনেশুনে আত্মহননের পথে পা বাড়ানো। এখন দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো বলছে নিট গার্মেন্টসের কাঁচামাল হিসেবে সুতার একটি বড় অংশ জোগান দিতে প্রস্তুত, বাস্তবতা হলো তাদের উৎপাদনক্ষমতার মাত্র ৬০ শতাংশ ব্যবহার করছে এবং বিভিন্ন কারণে লোকসান দিচ্ছে। এখন সে শিল্পকে বাঁচাতে কি নতুন করে অন্য শিল্পগুলোকে মেরে ফেলবেন? আমরা শুধু দেশীয় শিল্পে কেন বসে থাকব, আন্তর্জাতিক বাজারেও আমাদের শিল্পকে ছড়িয়ে দিতে হবে।’
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘আপনারা একটি ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচাতে গিয়ে যদি অন্য দুই-তিনটি ইন্ডাস্ট্রিকে বন্ধ করে দেন, তাহলে সেটি কোনোভাবেই টেকসই বা যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত হতে পারে না। একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বিবেচনা করা দরকার—আপনি যদি সুতা আমদানি বন্ধ করেন তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আগামী দিনগুলোয় ফ্যাব্রিক আমদানি শুরু হয়ে যাবে। কারণ আমরা চীন থেকে তুলনামূলক কম দামে ফ্যাব্রিক আমদানি করতে পারি। সেই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের হাজার হাজার স্পিনিং, উইভিং ও ডায়িং মেশিনসহ সংশ্লিষ্ট পুরো ভ্যালু চেইনটাই বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। অর্থাৎ স্পিনিং মিলকে বাঁচাতে গিয়ে আপনি পুরো টেক্সটাইল ভ্যালু চেইন ধ্বংস করার পথ তৈরি করছেন। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘এক বছর ধরে আমরা বলে আসছি, গার্মেন্টস শিল্প আইসিইউতে আছে। এ পরিস্থিতিতে যদি স্পিনিং শিল্পকে বাঁচাতে গিয়ে অন্যকে মেরে ফেলেন, তাহলে পাটের মতো দ্বিতীয় শিল্প হিসেবে এটিও ধ্বংস হবে।’ এ সময় দেশের ব্যাংকগুলো বিভিন্ন কায়দায় টাকা লুটপাট করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দেশীয় উৎপাদনকারীরা স্থানীয় পর্যায়ে মানসম্মত সুতা সরবরাহ করতে পারলে ২০ সেন্টের বেশি দিয়েও পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা তা ব্যবহার করবেন বলেও জানান বিকেএমইএ সভাপতি।
এ সময় বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান, সহসভাপতি রেজোয়ান সেলিম, সহসভাপতি (অর্থ) মিজানুর রহমান ও মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী, পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুর রহিম, ফয়সাল সামাদ, মোহাম্মদ আবদুস সালাম, সুমাইয়া ইসলাম ও কাজী মিজানুর রহমানসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
বিটিএমএ সভাপতির দাবি: বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত কিছু তথ্যকে সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন। তিনি এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, বিটিএমএ, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সঙ্গে আলোচনা করেই ট্যারিফ কমিশন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করে। ওই প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই শেষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কেবল ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা (এইচএস কোড ৫২০৫, ৫২০৬ ও ৫২০৭) বন্ড সুবিধার বাইরে রাখার সুপারিশ করেছে। এতে নতুন করে কোনো শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেয়া হয়নি এবং বর্তমানে সেফগার্ড ডিউটি আরোপেরও কোনো সিদ্ধান্ত নেই।
শওকত আজিজ বলেন, ‘বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত সুতা আমদানির মাধ্যমে তৈরি পোশাক খাতের দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তবে কোনো সুবিধা পাচ্ছে না। বরং এ সুবিধার মূল উপকারভোগী হচ্ছে বিদেশী ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো। অন্যদিকে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেও পার্শ্ববর্তী দেশের সরকারের দেয়া প্রতি কেজিতে প্রায় ৫০ সেন্ট ভর্তুকির কারণে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে এবং টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি আরো বলেন, ‘এসব বাস্তবতা বিবেচনায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) এমন কিছু সুতাকে বন্ড সুবিধার আওতামুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে, যেগুলোর শতভাগ সরবরাহ সক্ষমতা দেশীয় মিলগুলোর রয়েছে। এ প্রস্তাব দেয়ার আগে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তর ও কর্মকর্তারা তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে একাধিকবার আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন।’
বিটিএমএ সভাপতি জানান, এর আগেও অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে বিটিএমএ, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা একমত হয়েছিলেন যে যেসব সুতা শতভাগ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন সম্ভব, সেগুলো বন্ড সুবিধার বাইরে আনা যেতে পারে। অথচ সেই সমঝোতাকে উপেক্ষা করে এখন বিষয়টিকে একতরফা সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা কাম্য নয়।
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধার আওতায় নির্দিষ্ট কিছু সুতার শুল্কমুক্ত আমদানি বন্ধের সুপারিশ করে এনবিআরকে চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। চিঠিতে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ করে মন্ত্রণালয়। এ সিদ্ধান্তকে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো স্বাগত জানালেও তা প্রত্যাহারের দাবি পোশাক শিল্প ব্যবসায়ীদের। এ নিয়ে ১৮ জানুয়ারি অর্থ উপদেষ্টা, বাণিজ্য উপদেষ্টা ও এনবিআরের চেয়ারম্যান বরাবর চিঠি দিয়েছে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ।